ষড় রিপু
কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য এগুলো কি? কিভাবে ধ্বংস করবো!?
এই জগতে যারা গুরু ভাবনা-ময় তারাই সবচেয়ে বেশি সুখী । কারণ তারা তাদের সমস্ত জড় জাগতিক কামনা বাসনা পরিত্যাগ করে সবকিছু গুরুর রাঙ্গা চরণে সমর্পণ করেছেন। আর এই জগতে আরেক শ্রেণীর মানুষ আছ, আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রীয় তৃপ্তি নিয়ে ব্যস্ত । কিন্তু কখনও একবার ও ভেবে দেখলাম না! আমাদের প্রকৃত করণীয় কি ? যেমন একজন মানুষের পাঁচটি ইন্দ্রিয় রয়েছে এ কথা আমরা সবাই জানি। ইন্দ্রিয়গুলো হলো--- কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, চক্ষু ও ত্বক। আর রয়েছে ‘ষড়রিপু’ অর্থাৎ মানুষের চরম ও প্রধান ছয়টি শত্রু হলো ---- কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য। সমস্ত আধ্যাত্মিক শিক্ষার মূল শিক্ষা হল এই পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে এই ষড়রিপু’কে ধ্বংস করা।
কাম রিপু..
কাম শব্দের অর্থ কামনা, আবার মনে যে ভাবের উদয় হলে নারী পুরুষের প্রতি ও পুরুষ নারীর প্রতি আকৃষ্ট হয় তাকেও বলে কাম। মানুষ যদি কাম রিপুর বশীভূত হয়ে রিপুর গোলামী করে সে চরিত্রহীন হয়, কামনা দ্বারায় মানুষ জীবনে বেঁচে থাকার শক্তি পায়, কামনা আছে বলেই মানুষ মানুষকে ভালবাসে ঘর বাঁধে, সংসারধর্ম পালন করে। কাম থেকে ক্রোধের জন্ম আবার কামেতে-ই প্রেমের জন্ম।
ক্রোধ রিপু..
ক্রোধের অপর নাম রাগ। রাগ দুই প্রকারঃ- রাগ এবং অনুরাগ। মানুষ ক্রোধ রিপুর বশবর্তী হয়ে অতিতুচ্ছ বিষয় নিয়ে মারামারি কাটাকাটি করে । ফেলে যার ফল নিজের জীবনে সংসারে সমাজে অশান্তি বয়ে আনে। তাই ক্রোধ কে সম্বরণ করে ধৈর্য্য ধারণ করা জ্ঞানীর পরিচয়। ক্রোধ রিপুকে বশীভূত করতে না পারলে জীবনের কোন কাজেই সফলতা আসে না, ক্রোধ রিপুকে বশীভূত করতে হলে ধৈর্য্য, সহনশীলতা ও ক্ষমা গুণের অধিকারী হতে হয়। মানুষ তার জীবনে রাগের বশবর্তী হয়ে যত কাজ করে তার সামান্যতম যদি অনুরাগের সাথে ঈশ্বরের উপাসনায় মনোনিবেশ করতে পারতো তাহলে নিশ্চয় সাধনায় সিদ্ধিলাভ করত।
লোভ রিপু..
অতৃপ্ত আত্মাকে তৃপ্ত করার ও অপ্রাপ্তি বস্তুকে তৃপ্তিকর করার প্রবল ইচ্ছার নাম লোভ। অতিরিক্ত লোভের কারণে মানুষ বিবেকহীন হয়ে মনুষ্যত্ব, ধর্ম-কর্ম হারিয়ে ফেলে। লোভকে বশীভূত করতে হলে একান্তভাবে আত্মসংযমী হতে হবে, সংযম অভ্যাস দ্বারা লোভকে বশীভূত করা যায়। মানুষ লোভের বশবর্তী হয়ে যত কিছু করে তার সামন্যতম অংশ যদি ঈশ্বরের নাম গুণগানের লোভে রসনাকে নিযুক্ত করতে পারতো তা হলে নিশ্চয় ঈশ্বরের অসীম কৃপা লাভে সমর্থ হত।
মোহ রিপু..
কোন কিছু বিষয়ে অবাস্তবকে বাস্তব মনে করে এবং অল্প সাময়িক কিছু কিছু বিষয়ের উপর ভুল ধারণা পোষন করে তাতে মোহিত হয়ে থাকার নাম মোহ। মানুষ যখন স্বপ্ন দেখে তখন স্বপ্নকে বাস্তবতা জ্ঞানে আনন্দে উল্লসিত হয়, দুঃখে মানষিক কষ্ট অনুভব করে, কিন্তু স্বপ্ন ভেঙে গেলে বুঝতে পারে সব-ই ভূল বা অবাস্তব, তদ্রূপ প্রত্যহ নিজের চোখের সামনে মানুষ মৃত্যু বরণ করছে এবং মানব দেহের শেষ পরিনতি কি তাও প্রত্যক্ষ করছে, তবুও ক্ষণস্থায়ী মানুষ নিজেকে চিরস্থায়ী মনে করে, অহংকারে মত্ত হয়ে সামাজিক অশান্তি সৃষ্টি করে। এ জগতে অনেক মোহ রয়েছে নেশার মোহ, অর্থ-সম্পদের মোহ, রূপের মোহ, পূরুষের পরস্ত্রীতে মোহ, নারীর পর পুরুষের মোহ এবং অন্যের থেকে নিজেকে অসুখী মনে করে মানষিক কষ্ট ভোগ করা। জ্ঞানীজনের উপদেশ ও সাধুসঙ্গ ছাড়া মোহ থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না। মানুষ মোহের বশবর্তী হয়ে যে ভাবে জীবন অতিবাহিত করে মনে তার সামন্যতম অংশ যদি মানুষকে ভালবাসা ও ঈশ্বরকে পাওয়ার মোহ সৃষ্টি হত তাহলে মানব সমাজে আসত অনাবিল শান্তি এবং ঈশ্বরকে পাওয়ার পথ হত সুগম।
মদ রিপু..
মানুষের সাধারণ ভাবে জীবন-যাপন করার মত বিশেষ প্রয়োজনীয় বিষয় বস্তু সমুহ থাকা সত্ত্বেও অতৃপ্ত মন অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী হওয়ায় মনের সে অস্থিরতা আরও চাই আরও চাই ভাব তার নাম মদ। মদ হচ্ছে কাম-ক্রোধ-লোভের অতি মাত্রায় বহিঃপ্রকাশ । মদরিপু থেকে মুক্তি পেতে হলে সমাজের উঁচুতলার ধনী লোকের দিকে নজর না দিয়ে, গরীব-দুঃখী ও শারীরিক ভাবে প্রতিবন্ধীদের দিকে গভীরভাবে মনযোগ নিবন্ধ করলে ক্রমে-ক্রমে মদরিপু থেকে মুক্তি পাওয়া যাই। মানুষ মদ রিপুর বশবর্তী হয়ে যে ভাবে জীবন-যাপন করে তার সামান্যতম যদি ধর্ম-কর্ম ও ঈশ্বরের প্রতি নিবন্ধ করে তাহলে সহজেই মানুষের মত মানুষ হওয়া যায় ও ঈশ্বরের চরণ লাভে সমর্থ হয়।
মাৎসর্য্য রিপু...
অন্যের ভাল সহ্য করতে না পারা এবং অতি আপন জনকেও অযথা সন্দেহের চোখে দেখা মাৎসর্য্য রিপুর কাজ। মাৎসর্য্য রিপুর বশবর্তী মানুষ অন্যের ভাল সহ্য করতে না পারার কারণে অপরের দুঃখে আনন্দিত হয় অপরের আনন্দে হিংসা হয় এবং মনে মনে অপরের অনিষ্ট চিন্তা করে। একমাত্র গুরুর উপদেশ ও সাধু সঙ্গ ব্যতিত মাৎসর্য্য রিপু কোন ভাবেই বশীভূত হয় না।
মানুষ যে ভাবে মাৎসর্য্য রিপুর বশবর্তী হয়ে অন্যের অনিষ্ঠ চিন্তা করে তার সামান্যতম যদি নিজের অন্তরের কৃ-প্রবৃত্তি গুলোর অনিষ্ঠ চিন্তা করতো তাহলে নিশ্চয় মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটতো এবং মানব জীবন ধন্য হত।
আসুন সুস্থ্য জীবন ও সুন্দর সমাজ গড়তে শিক্ষা-দীক্ষা গ্রহণ করি, সাধুসঙ্গ করি, প্রকৃত শিক্ষা অর্জন করি, আত্মজ্ঞান লাভ করে অন্যকে পথ দেখায়। নিজের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ষড়রিপু কে দমন করার কৌশল আয়ত্ত করে সারা বছর জুড়ে একটি সুখী এবং সুন্দর জীবন গড়ার শিক্ষা নিই গুরুর কৃপায়
Comments
Post a Comment